রিভিউ-শেষের কবিতা

শেষের কবিতা

বইয়ের নাম ‘শেষের কবিতা’। নাম শুনলে নিজের অজান্তেই একটা কৌতূহল কাজ করে। মনে হয়, কী আছে এই কবিতায়? আপনাদের কী মনে হচ্ছে তা আমি জানিনা তবে আমার তাই মনে হয়েছিল। তাই কৌতূহল মেটাতে একদিন পড়তে শুরু করেছিলাম রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা বইটি। তারপর এই একটা বই অনেকবার পড়েছি, প্রতিবারই মনে হয়-প্রথমবার পড়ছি! 

এবার শেষের কবিতা বইটি নিয়ে কথা বলা যাক-

শেষের কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি রোম্যান্টিক উপন্যাস। শেষের কবিতা উপন্যাস হলেও কাব্যের ছোঁয়াও আছে যথেষ্ট। সে তো থাকবেই, না থাকলে আর আমরা শেষের কবিতার রহস্য উদ্ঘাটন করব কীভাবে! প্রেম-ভালোবাসা, বিবাহ, সংসার জীবন এসবের ব্যাপারে অনেক তত্ত্ব দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ এই উপন্যাসে। ইউরোপীয় মতে বিয়ের ক্ষেত্রে সখ্যভাবটাই প্রধান নয় বরং সংস্কৃতি গত বা বুদ্ধিগত মিলনকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু জীবনযাত্রার আদর্শে অমিল হলে সংসার জীবনে ছন্দপতন হয় এবং সংসার জীবনের অবসান ঘটে। এমন সব কথাই মাথায় আসে বইটি পড়লে।

বইটির মুল কাহিনীকে আমার কাছে চতুর্ভুজাকার বলে মনে হয়েছে। অমিত, লাবণ্য, কেতকী এবং শোভনলালের প্রণয় দ্বন্দ্ব।মূলত অমিত আর লাবণ্যের ভালোবাসার পর্বটি আলোচনায় থাকলেও বইয়ের শেষে গিয়ে পরিণতি ঘটে ভিন্ন।ফলে কেতকী আর শোভনলাল নীরবে থাকলেও শেষ পরিণতিতে তাদেরকেও গুরত্বপূর্ণ করে গড়ে তুলেছে লেখক।এই পরিণতি নিয়ে কারো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলে কবিগুরু তা অমতের এই কথার মাধ্যমে পরিষ্কার করে দিয়েছেন-

“কেতকীর সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালোবাসারই, কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল- প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যের সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইল দিঘি,সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।“

বইয়ের মাঝে যদি কোনো ত্রুটি থেকেও থাকে তাহলে তা শেষের কবিতার শেষ কবিতাটির মাধ্যমে লেখক দারুণভাবে পুষিয়ে দিয়েছেন। শেষের কবিতার শেষ কয়েকটি লাইন-

“ হে ঐশ্বর্যবান,

তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান-

গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।“

প্রধান চরিত্র

  • ১) অমিত          
  • ২) লাবণ্য
  • ৩) কেতকী(কেটি)
  • ৪) শোভনলাল
  • ৫) যোগমায়া প্রমুখ

বইয়ের প্রতি ভালোবাসা আমার এই জায়গা গুলোতে-

  • জ্ঞানের চর্চায় যার মনটা নিরেট হয়ে ওঠে সেখানে উড়ো ভাবনার গ্যাস নীচ থেকে ঠেলে উঠবার মতো সমস্ত ফাটল মরে যায়, সে মানুষের পক্ষে বিয়ে করবার দরকার হয় না
  • আপন রুচির জন্যে আমি পরের রুচির সমর্থন ভিক্ষে করি নে
  • যে রত্নকে সস্তায় পাওয়া গেলো তারও আসল মুল্য যে বোঝে সেই জানব জহুরি।
  •  দুইয়ের কানে যেটা এক পাঁচের কানে সেটা ভগ্নাংশ।
  •  আমার জীবনের তাপ জীবনের কাজের জন্যেই।
  • অন্তরাত্মার গভীর উপলব্ধি প্রকাশ করতে হয়- কেউ বা করে জীবনে, কেউ বা করে রচনায়- জীবনকে ছুঁতে  ছুঁতে।
  • অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা যাকে পাওয়া বলি সে আর কিছু নয়, হাতকড়া হাতকে যেরকম পায় সেই আর-কি।
শেষের কবিতা
image sourse:google
  • বিয়ে সকলের জন্যে নয়। খুঁতখুঁতে মন যাদের তারা মানুষকে খানিক খানিক বাদ দিয়ে দিয়ে বেছে বেছে নেয়। কিন্তু বিয়ের ফাঁদে জড়িয়ে পরে স্ত্রী পুরুষ যে বড় বেশি কাছাকাছি এসে পরে –মাঝে ফাঁক থাকে না। তখন একেবারে গোটা মানুষকে নিয়েই কারবার করতে হয় নিতান্ত নিকটে থেকে। কোন একটা অংশ ঢাকা রাখবার জো থাকে না।
  •  বিয়ে করলে মানুষকে মেনে নিতে হয়, তখন আর গড়ে নেবার ফাঁক পাওয়া যায় না।
  • বৎসরের পর বৎসর নীরবে চলে যায়, তার মধ্যে বাণী একদিন বিশেষ প্রহরে হঠাৎ মানুষের দ্বারে এসে আঘাত করে। সেই সময়ে দ্বার খোলবার চাবিটি যদি না পাওয়া যায় তবে কোনোদিনই ঠিক কথাটি অকুণ্ঠিত স্বরে বলবার দৈব শক্তি আর জোটে না।
  • ঐশ্বর্য দিয়েই ঐশ্বর্য দাবি করতে হয়, আর অভাব দিয়ে চাই আশীর্বাদ।
  • সহজকে সহজ রাখতে হলে শক্ত হতে হয়। ছন্দকে সহজ রাখতে চাও তো যতিকে ঠিক জায়গায় কষে আঁটতে হবে।
  • মেনে নেওয়া আর মনে নেওয়া এই দুইয়ে যে তফাত আছে।
  •  মেয়েদের ভালোলাগা তার আদরের জিনিসকে আপন অন্দরমহলে একলা নিজেরই করে রাখে, ভিড়ের লোকের কোনো খবরই রাখে না। সে যত দাম দিতে পারে সব দিয়ে ফেলে। অন্য পাঁচজনের সাথে মিলিয়ে যাচাই করতে তার মন নেই।
  •  রবি ঠাকুরের লেখা যতক্ষণ না লোকে একেবারে ভুলে যাবে ততক্ষণ ওর ভালো লেখা সত্য করে ফুটে উঠবে না।

লেখনশৈলীঃ শেষের কবিতা বইটি চলিত ভাষায় লেখা হওয়ায় বেশ সাবলীল ভাবেই পড়া যায়। এই বইয়ের কবিতাগুলোও সহজ ভাষায় লেখা। তাছাড়া চরিত্রবিন্যস অসম্ভব ভালো! প্রত্যেকটি চরিত্রই নিজের জায়গায় ঠিকাঠাক( perfect)। আপাত দৃষ্টিতে কোনো চরিত্রকে ভালো কোনো চরিত্রকে খারাপ মনে হলেও একটু গভীরে গিয়ে ভাবলে দেখা যায় সবার কার্যকলাপই ঠিক।

শেষের কবিতা
ইমেজ সোর্সঃ উইকিপিডিয়া

লেখক পরিচিতিঃ  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ই মে ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে(২৫ শে বৈশাখ ১২৬৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালেই তার কবি প্রতিভার উন্মেষ ঘটে। মাত্র ১৫ বছর বয়েসে তার বনফুল কাব্য প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথ তার গীতাঞ্জলি কাব্যের জন্য ১৯১৩ সালে এশীয়দের মধ্যে প্রথম সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কার অর্জন করেন। সাহিত্যের প্রায় সকল শাখাই তার অবদানে সমৃদ্ধ। ৭ই আগস্ট ১৯৪১ সালে কলকাতায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বই পরিচিত

বইঃ শেষের কবিতা

লেখকঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রকাশকালঃ একুশে বইমেলা ২০১৬

প্রকাশকঃ আবরারুল হুদা

প্রকাশনীঃ রহমান বুকস

অক্ষরবিন্যাসঃ কম্পিউটার ল্যান্ড

মুদ্রণঃ আল-কাদের প্রেস

প্রচ্ছদঃএ হুদা

মুল্যঃ ১৩০ টাকা

আরো পড়ুন- হ্যারি পটার সিরিজ

আরো জানতে আমাদের কন্ঠনীড়ে সাইটে থাকুন