নিষিদ্ধ লোবান (সৈয়দ শামসুল হক)

নিষিদ্ধ লোবান

‘নিষিদ্ধ লোবান’  মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখা একটি উপন্যাস।উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বিলকিস এবং সিরাজ ওরফে প্রদীপ। মুক্তিযুদ্ধের সময় সিরাজ এবং বিলকিসের সংগ্রামকে তুলে ধরেছেন লেখক।

#স্পয়লার এলার্ট


বিলকিস ঢাকা থেকে আসে জলেশ্বরীতে মা ভাইয়ের কাছে।কিন্তু জলেশ্বরীর আগের স্টশন থেকেই ট্রেন চলাচল বন্ধ।তাই সে দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে হেটেই পারি দিতে চায় ৫ মাইল পথ।২৫ শে মার্চ রাত থেকেই তার স্বামী আলতাফ নিখোঁজ। মা ভাইয়ের টানেই সে যুদ্ধের সময় চলে আসে জ্বলেশ্বরীতে।স্টেশনে পরিচয় হয় কিশোর সিরাজের সাথে।দুজনে জলেশ্বরীতে গিয়ে আবিষ্কার করে এক মৃত্যুপুরী। তাদের সংগ্রাম শুরু হয় এখান থেকেই।আপনজনদের কবর দেওয়ার লড়াই,বেচে থাকার লড়াই,শত্রুদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার লড়াই!

উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার পাকিস্তানি নরপিশাচের নির্মমতার চিত্র।তারা বাঙালীদের ভাবতো কুকুর,তাদের রক্ত অশূচি,বাঙালীদের মেরে ফেলে রাখা হতো শেয়ালের খাদ্য হিসেবে!মা বোন কাউকেই রেহাই দিত না রক্তখেকো পাকিস্তানি হানাদারের দল।তাদের চেয়েও নির্মম ছিল বিহারী এবং দেশীয় ঘাতকেরা!সবার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে বিলকিস আর সিরাজ।তারা জীবন দিয়ে(!) হলেও ভাইদের কবর দিতে চেয়েছে,দিতে চেয়েছে মানুষের সম্মান!


পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ


কিছু কিছু বই থাকে যেগুলো একবার পড়লে আরেকবার পড়ার সাহস হয় না,সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের ‘নিষিদ্ধ লোবান’ এমনই একটি বই।বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তো কত বই লেখা হয়েছে,কিন্তু নিষিদ্ধ লোবান লেখা হয়েছে একটাই-ভবিষ্যতেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আর এমন বই লেখা  হবে না বলেই আমার ধারণা।ছোট্ট একটি বই,কিন্তু কী দারুণ তার লেখনীশৈলী! দুটো মানুষকে কেন্দ্র করে মুক্তিযুদ্ধের সিংহভাগ নির্মমতা তুলে ধরেছেন লেখক।একদম শেষের লাইনটা,’মশালের মতো প্রজ্বলিত সমস্ত শরীর দিয়ে তাকে ঠেসে ধরে রাখে বিলকিস।’
সম্পূর্ণ বইটি যে পড়েছে তার পক্ষে এই লাইন মন থেকে মুছে ফেলা প্রায় অসম্ভব!k

নিষিদ্ধ লোবান বইয়ে থাকা ভালো লাগার কিছু লাইনঃ

বিষয়টা এমন যে যখন একজন ব্যক্তি আত্মকেন্দ্রিকটা ভুলে গিয়ে অনেকের মাঝে নিজেকে খুজে নিতে পারে অন্যের ভালো মানে নিজের ভালো মনে করতে পারে তখনি কেবল এমন টা হতে পারে।


পালাবার সবচেয়ে ভালো জায়গা শত্রুর ঘাটির ভেতরে।


কখনো কখনো সমস্ত মানুষের মুখ এক হয়ে যায়।


কেউ ভেঙে পড়ে না,শোক কখনো এত বড় নয় যে মানুষ মাথা তুলে দাড়াতে পারে না।


সোনা পুড়লে কিন্তু আরো খাঁটি হয়। মানুষ কে বিপদ দিয়ে বিচার করলে অনেকটা এরকমই হবে। মানুষের মন কে আরো দৃঢ় আরো শক্তিশালী করার জন্যই বিপদ গুলো হানা দেয় তাদের মনের দুয়ারে। আর মানুষ জন্মের আগ থেকেই বিপদের সাথে যুদ্ধ করে করেই পৃথিবীর আলো দেখে। তাই শোক কখনো সাহসের ঊর্ধ্বে না।


চাঁদ কখনো আলো দেয়,কখনো মেঘের আড়ালে কৃপণ হয়ে যায়।

লেখক পরিচিতিঃ সৈয়দ শামসুল হক এর জন্ম কুড়িগ্রাম জেলায় ১৯৩৫ সালের  ২৭ ডিসেম্বর। কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, অনুবাদ তথা সাহিত্যের সকল শাখায় সাবলীল পদচারণার জন্য তাকে ‘সব্যসাচী লেখক’ বলা হয়। তিনি ৬১ বছরের লেখনী জীবনে  মাত্র ৩১ বছর বয়সে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেছিলেন।এছাড়া বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদক এবং ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।এই সব্যসাচী লেখকের মৃত্যু ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। 

বই পরিচিতি


বইঃ নিশিদ্ধ লোবান

লেখকঃ সৈয়দ শামসুল হক

প্রকাশনীঃ অনন্যা প্রকাশনী

প্রথম প্রকাশঃ এপ্রিল ১৯৮১

প্রচ্ছদঃ মাসুক হেলাল

রিভিউয়ারঃ সুমাইয়া শেফা

Leave a Reply