রিভিউ: জলের দেশে স্থলপদ্ম

জলের দেশে স্থলপদ্ম ” জলের দেশে স্থলপদ্ম ” বইটি পড়ে শেষ করেছি বেশ কিছুদিন আগেই।  বইটি নয়টি ছোট গল্পের সমন্বয়ে […]

জলের দেশে স্থলপদ্ম

” জলের দেশে স্থলপদ্ম ” বইটি পড়ে শেষ করেছি বেশ কিছুদিন আগেই।  বইটি নয়টি ছোট গল্পের সমন্বয়ে গঠিত। দুটি গল্প লেখক আগে সোশাল মিডিয়া সাইডে দিয়েছিলেন বাকি সাতটি গল্প একদম নতুন। “জলের দেশে স্থলপদ্ম” বইটি পাঠের মাধ্যমেই ওয়ালিদ প্রত্যয়  এর লিখার সাথে আমার পরিচয়।  ওনার লেখা আমি এই প্রথম পড়ি এবং ওনার লেখার ধরণ বেশ ভালোও লাগে ।  তো গল্প গুলো নিয়ে একটু বলি।  তার আগে বলি, লেখক গল্পগুলো শুরু করেছেন একটা গল্পের মাধ্যমে, গল্প দিয়ে গল্প শুরু এটা বেশ মজার এবং থ্রিলিং  ছিলো।  

জলের দেশে স্থলপদ্ম
জলের দেশে স্থলপদ্ম ছবি : Nusrat Zaman Sujana

  • বইটির প্রথম গল্প ‘ পিঁপড়া ‘ ।  পিঁপড়া গল্পে দেখা যায় নিজের লাশ নর্দমায় ভেসে থাকা অবস্থা  ব্যক্তি দেখতে পাচ্ছে।  নর্দমায় ভেসে থাকা তার লাশের সাথে  পিঁপড়ার কথোপকথন। লাশ তথা তাকে খাওয়া নিয়ে পিঁপড়ের রাজনীতি।  এ গল্পটিতে লেখক নাম পুরুষের ব্যবহার করেন। 

  • দ্বিতীয় গল্পটি  হচ্ছে ‘ মেয়েটি সাগ্রহে প্রশ্ন করলো ‘। প্লট টিতে দুর্ভিক্ষের সময়কার একটি চিত্র তুলে ধরা হয়।  দূর্ভিক্ষে একদিকে যেমন উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষেরা বাড়ি বসে মাংস রান্না করে আনন্দ করে খায়, পরিবারে নতুন সদস্য আশার আনন্দে মেতে ওঠে। অন্যদিকে তেমনি হাজার হাজার পরিবার এই দূর্ভিক্ষে না খেতে পেয়ে মারা যাচ্ছে।  কেউ আবার গল্পের নামের মতো প্রশ্ন করে বসে! বেঁচে থাকার আসল লড়াই অস্তিত্ববাদকে টিকিয়ে রাখার জন্যই ‘ মেয়েটাও সাগ্রহে প্রশ্ন করে ‘।  

  • ‘ হৃৎপিণ্ডের ঘ্রাণ ‘ নিতান্ত সাধারণ মানুষ শামসুল আলমকে নিয়ে লেখা।  যে হঠাৎ করে কিছুক্ষণের জন্য অন্ধ হয়ে যায়৷ গল্পটিতে সমাজের ক্ষমতাশীল মানুষের ক্ষমতার ব্যবহার আর শামসুল আলমের অন্ধ  ভিক্টিম হয়ে থাকার কথা বলা হয়। তারপর লেখকের গল্পের মোড় নেয় ক্ষমতাবানেরা তার ক্ষমতার ব্যবহার করে যায় তখন সে দৃশ্য না দেখার জন্য শামসুল আলম চিরতরে অন্ধ হয়ে যেতে চায়। কিন্তু পারেনা।  লেখক হয়ত শামসুল আলমের এই দৃশ্য দেখে চিরঅন্ধত্ব চাওয়ার সাথেই হৃৎপিণ্ডের ঘ্রাণটা শুনতে পায়!! 

  • পরবর্তী গল্পটি হচ্ছে  ‘ ল্যাম্পপোস্ট ‘। ল্যাম্পপোস্ট গল্পটিও লেখক নাম পুরুষের ব্যবহারের মাধ্যমে লেখা শুরু করেন। তবে হুট করে লেখক ন্যারেশন চেঞ্জ করে উত্তম পুরুষে চলে যান।  এ গল্পটি পুরোটা সাজিয়েছেন লেখক অন্ধকারে৷ ল্যামপোস্টের আলোয় সংসার করা, রান্না করা, রাতের খাবার খাওয়া ৷  সবচেয়ে মূল থিম ছিল রাতের অন্ধকারে ল্যাপপোস্টের আলোর নিচে ক্ষুদার্ত চার বছরের বাচ্চার মুখে স্তন দেওয়া।  

  • ‘বিচার’ গল্পটি তে যুবকটি বিচারের আগে প্রশ্ন করে বসে সমাজ, ধর্ম, রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে।  এ সব প্রশ্ন হয়ত সকলেরই।  কিন্তু সহসের জোরে যুবকটা যখন প্রশ্ন করে রাজাকে তখন রাজা শাস্তি দেওয়ার বদলে চিন্তায় পরে যায়, আসলে মানুষ অপরাধ করে কেন?  লেখকের এখানে বেশ কিছু প্রশ্ন করার মাধ্যমে তার সাহসীতার প্রকাশ পায়।  গল্পটিমে পরকালের বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে সৃষ্টিকর্তাকে প্রশ্ন করা নিয়ে৷ এ ব্যপারটা ব্যক্তিগত ভাবে আমার একটু দৃষ্টিকটু লাগলেও প্রতীকী অর্থে ধরে নেওয়ার পর আমার কাছে গল্পটা বেশ লেগেছে৷  আসলেই তো মানুষ অপরাধ করে কেন?  

  • ‘ রক্তিম গেলাসে তরমুজ মদ ‘ গল্পটি এই বইয়ে আমার সবচেয়ে পছন্দের একটি গল্প।  বইটির ফ্লাপে এ নিয়ে পড়ার পর বইয়ের প্রতি আগ্রহটা আরো বেশি ছিলো।  আর যখন গল্প পড়া শুরু করলাম বুঝতেই তো পারছেন উত্তেজনার কোন পর্যায়ে ছিলাম।   গল্পটিতে জীবনানন্দের সাথে ভ্যান গগের দেখা হয়৷ তারা আড্ডা দেয় সাথে রক্তিম গেলাসে তরমুদ মদ।  দুজন একাকীত্ব বরণ করে নেওয়া একা মানুষ গল্প করে তাদের প্রথম চুমু নিয়ে।  জীবনানন্দ যার সাথে দেখা হলে বলতে চায় ” ময়না, তোরে ছাইড়া থাহোন যায়না “।  তারা গল্প করে ভিনগগের চিত্রকলা আর জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে।  তারপর আবার আলাদা হয়ে যায় তারা৷  একাকীত্ব বরণ করে দুজন মানুষ আবার চলে তাদের সৃষ্টির পথ ধরে।  [ যদিও বাস্তব জীবনে ভ্যান গগের সাথে কখনোই জীবনানন্দের দেখা হয়না। ভ্যানের মৃত্যুর ন’বছর পরে জীবনানন্দের জন্ম ] 
    এ গল্পটি আমার অসম্ভব ভালো লাগেছে। যা নিয়ে হয়ত আমি আরো অনেকক্ষণ লিখেও শেষ করতে পারব না। বইয়ের এ পর্যায়ে এসে ওয়ালিদ প্রত্যয়ের প্রতি , তার লেখার মাত্রার প্রতি আমার আরো ভালো লাগা কাজ করে।  

  • তারপরের গল্প ‘ অলমোস্ট অটোবায়োগ্রাফি ‘ গল্পটাতো অন্যমাত্রা যোগ করে বলা বাহুল্য।  লেখক আগেই বলেছেন তিনি গল্পটি শতভাগ Panster হিসেবে লিখেছেন। এখানে তার লেখার মান বিচার করা যায়।  গল্পটিতে তিনি একজন লেখক এবং একজন কবির চিত্র তুলে ধরেছেন।  যে কবি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখার জন্য ঘুরে বেড়ায় – ” কখনো আশি টাকার বিনিময়ে রিক্সার একাত্তরে গমন, কখনো আবার রাধিকাপুরের অঞ্জন দত্তের গান,  পাগলিনী মায়ের একাত্তরের যুদ্ধে যাওয়া ছেলের ফিরে আসার অপেক্ষা। ” কবি তখনো তার শ্রেষ্ঠ কবিতা লিখার খোঁজে ঘুরে বেড়ায়৷ অবশেষে সে তার হাজার লেখার ভীরে তার লেখার শ্রেষ্ঠত্ব খোঁজে পায় সে ছেলে হারানো সেই পাগলিনী মাকে তার ছেলের চিঠি বলে চালিয়ে দেওয়া তার লেখা সে চিঠির মাঝে।  অশ্রুভেজা চোখে মা যখন বলেন আমার ছেলে চিঠি দিছে সে আসবে… 
  • মেঘনাদবধ কাব্য- রিভিউ

  • বইটির শেষ গল্প এবং নাম গল্প ” জলের দেশে স্থলপদ্ম “। গল্পটি বেশ সুন্দর এবং একটার পর একটা ধাক্কা দিয়ে গেছেন লেখক গল্পে৷  কাজলের বাবা মতিনের গল্প, কাজলের মা হারানো,  বন্যায় কবর থেকে  ভেজে ওঠা লাশের সাথে কাজলের বাবার কথামালা,  শার্টের বুক পকেটে মৃত্য স্ত্রীর আঙ্গুলের লাশ নিয়ে ঘুরা আরো অনেক কিছু।  পুরো গল্পটি পড়লে বুঝা যাবে কত সুন্দর যে গল্পটি!  বুঝা যাবে কিভাবে এটি নাম গল্প হওয়ার যোগ্যতা  নিয়েছে !  

🖋️Shojjoti hossen 

আরো জানতে আমাদের কন্ঠনীড়ে সাইটে থাকুন

ইন্টারনেট জগতের লুকায়িত সর্ববৃহৎ লেনদেন বাজার


Popular Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.