ইন্দুবালার ভাতের হোটেল

ইন্দুবালার ভাতের হোটেল “ঘুমের মধ্যে শুনতে পেলাম শঙ্খ চূড়ের কান্না ‘এ আনন্দ অসহ্য বোন; দিসনে লো আর,আর না’। জেগে উঠলাম […]

ইন্দুবালার ভাতের হোটেল

“ঘুমের মধ্যে শুনতে পেলাম

শঙ্খ চূড়ের কান্না

‘এ আনন্দ অসহ্য বোন;

দিসনে লো আর,আর না’।

জেগে উঠলাম ; দেখতে পেলাম

আর না দেবার সুখে 

কেয়া ফুলটি ঘুমিয়ে আছে

বিষধরের বুকে।”

 গল্পপ্রসঙ্গ

ইন্দুবালার ভাতের হোটেল
ইন্দুবালার ভাতের হোটেল

খুলনার কলাপোতা গ্রামের মেয়ে ইন্দুবালা। অন্য সব মেয়েদের মতোই নিজের শৈশব উপভোগ করছিলো বাড়ন্ত মেয়ে ইন্দুবালা। মনিরুল ছিলো তার সহপাঠী। তার সাথে ইন্দুবালার অনেক ভাব। তারা এক সাথে টিফিন খেতো, এক সাথে মেলা দেখতে যেতো, কবি জসিম উদ্দিন এর ” নকশিকাঁথার মাঠ ” মনিরুল পাঠ করে শুনাতো ইন্দুবালাকে। তাদের বন্ধুত্ব ক্রমেই গ্রামের অন্যদের চোখে কাঁটা দিচ্ছিলো। প্রতিদিন কেউ না কেউ এসে ইন্দুবালার বাবা, ঠাম্মা, মাকে অভিযোগ দিতো যে, মুসলিম ছেলে (মনিরুল) এর সাথে ইন্দুবালার এতো ভাব কীসের! ইন্দুবালার বাবাও যে মনিরুলকে খুব পছন্দ করতো তা কিন্তু নয়। কিন্তু মেয়ের মুখের উপরে কিছুই বলতে পারতেন না। মায়ের আগে থেকে বেশ আপত্তি ছিলো ইন্দুবালার স্কুলে যাওয়া নিয়ে। তার উপর হিন্দু মেয়ে হয়ে মুসলিম ছেলের সাথে বন্ধুত্ব-এ যেনো কিছুতেই মেনে নিতে পারেন নি তিনি।

বকুল ফুলঃ মনোয়ারুল ইসলাম

একরকম তাড়াহুড়ো করেই বাবা ইন্দুবালার বিয়ে ঠিক করেন কলকাতায় এক নেশারু দোজবরের সাথে। ইন্দুবালার বাবা-মা ভেবেছিলো তার মেয়ের বিয়ে দিবে কলকাতায়, আশে পাশে থাকবে চাকর চাকরানী এবং তার মেয়ে হবে রাজরানী। কিন্তু মেয়ে আর মেয়ের জামাই কে নিয়ে যখন বাবা প্রথম গেলো ইন্দুবালার শ্বশুর বাড়ি তখনই ব্রজমোহন বুঝে গিয়েছিলেন কি অনাসৃষ্টি করেছেন তিনি। নতুন বউ বাড়িতে উঠার নেই কোনো আয়োজন, নেই কোনো আনন্দ। ইন্দুবালা নিজেই তার বৌ ভাতের রান্না করেছিলো। গ্রামে বেড়ে উঠা সহজ সরল ইন্দুবালার জীবনে আসে নতুন মোড়। ক্রমেই ইন্দুবালা বুঝতে পারে, মাস্টার বলে বাবা যাকে তার সাথে বিয়ে দিয়েছে আসলে সে কখনও বিদ্যা অর্জন করেনি। অবশ্য তাকে মদ খাওয়া আর নারী নিয়ে ফুর্তি করার মাস্টার বলা যায়। আস্তে আস্তে ইন্দুবালা বুঝে গেলো মাস্টার রতনলাল মল্লিক তার শরীর আর তার গহনাগুলো চায়। সাঁতারু ও জলকন্যা ( শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়)অধিক শোকে ইন্দুবালা হয়তো পাথর হয়ে গিয়েছিলো। ইন্দুবালার শাশুড়ি একদিন দুনিয়ার হিসেব চুকে পরকালে গমন করলো। স্বামীর সংসার নিয়ে কোনো চিন্তা নেই তাই বিক্রি করতে করতে ইন্দুবালার সব গহনা বিক্রি করা হয়ে গিয়েছিলো, তাই বোধহয় মাস্টার রতনলাল ভেবেছিলো তার আর এ দুনিয়া থেকে কী লাভ! একসময় সেও পরলোকগমন করলো। ছোট ছোট দুই ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে ইন্দুবালা পথে বসেছে। এদিকে পাওনাদাররা ইন্দুবালাকে কথা শুনিয়ে যাচ্ছে। সব কিছু হারিয়ে যখন সে হতাশ তখন লছমি একদিন তার কাছে ২ টাকা দিয়ে বলেছিলো “মা ” আজ তোমার বাড়িতে দুটো ভাত মুখে দিবো।রিভিউ-শেষের কবিতা ইন্দুবালার ঘরে তখন রান্নার কিছুই ছিলো না। বাগানের পিছন থেকে কুমড়ো শাক দিয়ে শুরু হয়েছিলো তার “ইন্দুবালার ভাতের হোটেল”। এই বইটিতে আট টি অধ্যায় আছে। প্রতিটি অধ্যায়ে একটা করে রান্নার কথা বলা আছে। এই রান্না ইন্দুবালার অতীত এবং বর্তমানের স্মৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত। বইটিতে উল্লেখ রয়েছে ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের পাশাপাশি ইন্দুবালার ছেলে মেয়ে বড় হয়ে উঠার গল্প এবং লছমী সহ আরো অনেকের না বলা গল্প। এই বইটি একজন হার না মানা নারীর গল্প, যে কোনোদিন আনন্দ করেনি, কান্না করে নি, নিজেকে প্রকাশ করে নি। তার একটাই ধর্ম-মানুষকে খাইয়ে পূণ্য লাভ করা।

📝ব্যক্তিগত রেটিং ৯/১০

📢অনেকে বইটিকে হয়তো ভাববেন “আদর্শ হিন্দু হোটেলের” হাজারি ঠাকুর আর “ইন্দুবালার ভাতের হোটেল ” হয়তো একই প্লটে লিখা কিন্তু দুইটি গল্প অভিন্ন ও স্বতন্ত্র 

“ইন্দুবালা ভাতের হোটেল” উপন্যাসের   প্রিয় কিছু লাইন তুলে ধরা হলো : 

ইন্দুবালার ভাতের হোটেল

★হঠাৎ মাঝখান থেকে দেশটা স্বাধীন হলো।শুধু স্বাধীন হলো তাই না,দেশটা দু-টুকরো করে ভাগ করা হলো।দেশের নেতারা সেই দেশে বসবাসকারী সাধারণ মানুষদের কাছে অনুমতি নিল না,জানতে চাইলো না।এক মুহুর্তে ভিটেমাটি সব কিছু হয়ে গেল বিদেশ।রাতের আঁধারে,দিনের আলোয় মানুষ দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো।কে কোন অংশে যেতে পারবে তার যেন মারাত্মক মরিয়া প্রতিযোগিতা।তার সাথে বাধলো দাঙ্গা।রক্তক্ষয়ী।ভাই ভাইয়ের বুকে ছুরি মারলো।মেয়ে লাঞ্চিত হলো পড়শির কাছে। গোটা ভূখন্ড জুড়ে চললো নরহত্যা।তিনশো বছরের ইংরেজ রাজত্বের পর স্বাধীনতা উদযাপনের সে কী ভয়ঙ্কর উৎসব।

★অনেক কাছের হতে পারতো ইন্দুবালার।কিন্তু বিয়ের পরে কিছুদিন ছেনু মিত্তির লেনে থেকেই সে বুঝে গিয়েছিলো এ পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছেন যাঁরা চিরকালের জন্য একা হয়ে যান।তখন তাঁরা সেই নির্জন জগতের মধ্যে বাঁচতে ভালোবাসেন।

★তবুও ছেলে—মেয়েগুলোকে এত দূরে সরিয়ে রেখে কি পেলেন তিনি? একা বাঁচার সুখ? কার ওপর অভিমান করে একা হয়ে গেলেন তিনি? বাবা? রতনলাল মল্লিক? নাকি অদৃষ্ট?

★ ইন্দুবালার শরীর বেয়ে পেঁচিয়ে উঠেছে আরও একটা শরীর। বিষধর ফণা তুলে গ্রাস করছে যেন সে।মাস্টার রতনলাল মল্লিক বিছানার ওপরে তার পোয়াতি বউটাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে তখন।বন্ধ হয়ে আসছে ইন্দুবালার শ্বাস প্রশ্বাস। 

★ ইন্দুবালা বলেন ” জিজ্ঞেস কর মৈত্রী এক্সপ্রেস কোন প্ল্যাটফর্ম থেকে ছাড়বে?” একজন টিটি দেখিয়ে দেয়।”ওই তো,,,,,দাড়িয়ে আছে। কিন্তু ওদিকে তো যেতে পারবেন না। সময় হয়নি এখনও। টিকিট আছে তো? পাসপোর্ট,ভিসা? সব চেক হবে কিন্তু।” ইন্দুবালার ওইসব কিছুই নেই।  

★”এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়া মানুষের ভিড় বাড়ে।পাসপোর্ট ছাপ পড়ে।বাক্স প্যাঁটরা নিয়ে ইমিগ্রেশন পার করে মানুষ। এক সময়ে যে দেশটা নিজের দেশ ছিলো সেটারই বেড়া টপকায়।প্রত্যেক বছর বৃষ্টি আসে নিয়ম করে দু দেশেই।তবুও সীমান্তের দাগ মুছে যা না সেই জলে।ওটা ইন্দুবালার দাদুর স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়।”

  • ইন্দুবালার ভাতের হোটেল
  • কল্লোল লাহিড়ী
  • প্রকাশনী : সুপ্রকাশ 
  • পৃষ্ঠা : ১৬০
  • মূল্য: ২৩০( রকমারি মূল্য)
  • প্রচ্ছদ :  মেখলা ভট্টাচার্য 
  • প্রথম প্রকাশ :জুলাই,২০২০

আরো জানতে আমাদের কন্ঠনীড়ে সাইটে থাকুন


Popular Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.